জাতীয়

জাতীয় :3

রাজনীতি

রাজনীতি :3

রাজধানী

রাজধানী :3

সারাবাংলা

সারাবাংলা :6

আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক :3

অপরাধ

অপরাধ :3

প্রবাস

প্রবাস :3

টঙ্গীর মাদরাসায় শিক্ষককে থাপ্পড় ঘটনায় মুখ খুললেন মিজানুর রহমান আজহারী

মোঃ সোহাগ বকাউল প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর ২০২৬
গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদরাসায় সাত বছর বয়সী শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহি ও সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন ইসলামী স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। অন্যদিকে ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে।

গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি মাদরাসায় সাত বছর বয়সী শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে মাদরাসা শিক্ষায় শিশু সুরক্ষা, জবাবদিহি ও সুশাসনের ওপর জোর দিয়েছেন ইসলামী স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের আচরণের সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। অন্যদিকে ঘটনার তদন্ত চলছে এবং দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে।

আজহারির স্ট্যাটাস: রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে এসব কথা বলেন আজহারি। তিনি লেখেন, দেশে দ্বীনি শিক্ষা প্রসারে মাদরাসার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, প্রভাবশালী আলেম ও মাদরাসা পরিচালনায় সংশ্লিষ্টদের উচিত বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা করা। নিজেদের ভুল নিজেরা সংশোধন না করলে তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ নিতে পারে এবং পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা অযাচিত চাপের মুখে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

আজহারি উল্লেখ করেন, গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অনেক মাদরাসা ও হিফজখানা গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সিসি ক্যামেরা নেই, যথাযথ তদারকি নেই এবং মানসম্পন্ন পরিবেশ ও পাঠদান ব্যবস্থাও অনুপস্থিত। এসব প্রতিষ্ঠানের অপ্রীতিকর ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে মাদরাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে তিনি মনে করেন।

জবাবদিহি ও সুশাসনের আহ্বান: আজহারির বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়া মানে জবাবদিহি ও সুশাসনের ঊর্ধ্বে থাকা নয়। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহি আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত। এ জন্য তিনি কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করার কথা বলেন:

  • প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও নিবন্ধন
  • মানসম্মত পাঠ্যক্রম ও দক্ষ শিক্ষক
  • নিরাপদ অবকাঠামো ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া
  • নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও তদারকি

তিনি আরও বলেন, শিক্ষককে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ হলেই চলবে না। শিশুর বয়স, মানসিক বিকাশ ও আবেগ বুঝে বয়সোপযোগী ও মানবিক আচরণের সক্ষমতাও থাকতে হবে। আবাসিক মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আরও কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষক নিবন্ধন, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের মতো পদক্ষেপ বিবেচনার পরামর্শ দেন।

শাসনের নামে নির্যাতন নয়: শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি ও বেত্রাঘাতের ঘটনাও মাঝে মাঝে ঘটে, উল্লেখ করে আজহারি বলেন, এসব ঘটনা ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। শিশুর মনে ভয়, অপমান বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা সৃষ্টি করে, এমন আচরণ শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষ্য, শৃঙ্খলা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও মানবিকতার ভিত্তিতে।

চাইল্ড সেফটি পলিসির প্রস্তাব: প্রতিটি মাদরাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা (চাইল্ড সেফটি পলিসি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেন আজহারি। তাঁর মতে, এতে স্পষ্টভাবে থাকা উচিত:

  • শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য ও নিষিদ্ধ আচরণ
  • অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের পদ্ধতি
  • ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা

শিক্ষার্থীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে এবং অভিযোগকারীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা পায়, সে ব্যবস্থার ওপরও জোর দেন তিনি। গুরুতর নির্যাতনের ঘটনা অভ্যন্তরীণভাবে ধামাচাপা না দিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।

আচরণের সীমারেখা: আজহারি বলেন, শাসনের নামে ভয় দেখানো, অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি কিংবা অনুপযুক্ত স্পর্শ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত পরিসর ও মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি একান্তে সাক্ষাৎ ও ব্যক্তিগত বার্তার ক্ষেত্রেও নিরাপদ ও পেশাগত সীমারেখা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার তাগিদ: স্ট্যাটাসের শেষাংশে আজহারি গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের একই ধরনের দায়িত্বে পুনরায় নিয়োগ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থা রাখারও পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ ও প্রমাণিত অপরাধের পার্থক্য বজায় রেখে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলেন।

তাঁর মতে, আলেম-উলামা, মাদরাসা পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক, শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সীমিত সামর্থ্যের প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা দিতে হবে। আজহারি জোর দিয়ে বলেন, সংস্কারের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা নয়, বরং সক্ষমতা বাড়িয়ে নিরাপদ ও আস্থাশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা।

টঙ্গীর ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা: গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়ায় একটি মাদরাসার প্রথম শ্রেণির সাত বছর বয়সী এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম মোসলেম আহম্মদ, তাঁর বয়স ৩০ বছর। শিশুটির বাবার করা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত সোমবার মাদরাসার নিচতলার সিঁড়িতে শিশুটিকে নিপীড়ন করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা এই মামলায় বৃহস্পতিবার দুপুরে অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর শিশুটি মাদরাসায় যেতে চাইছিল না। প্রথমে কিছু না বললেও মা-বাবার জিজ্ঞাসাবাদে সে পুরো বিষয় খুলে বলে। পরিবারের অভিযোগ, বিষয়টি প্রকাশ করলে তাকে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। বুধবার দুপুরে স্বজনেরা মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় লোকজন জড়ো হন এবং শিক্ষককে মারধর করা হয়। পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নেয়।

মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অবস্থান: মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ আলমাছ হোসেন দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শিশুটির বাবার নেতৃত্বে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল মাদরাসায় ঢুকে শিক্ষককে মারধর করে। বাধা দিতে গেলে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও নিরাপত্তাকর্মীও আহত হন। তিনি কার্যালয় ভাঙচুর এবং ১৭ লাখ টাকা ও পাঁচটি মুঠোফোন লুটের অভিযোগও করেছেন। এ বিষয়ে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ থানায় পৃথক অভিযোগ দিয়েছে।

শিশুটির বাবার বক্তব্য: লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শিশুটির বাবা। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঘটনার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হুমকিমূলক মন্তব্য করা হচ্ছে। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানান।

পুলিশের বক্তব্য: টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা হয়েছে এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মাদরাসা কর্তৃপক্ষের ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগও আলাদাভাবে নথিভুক্ত হয়েছে। হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, দুই পক্ষই মৌখিকভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ করেছে। পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

শিশুর নিরাপত্তা কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর বিষয় নয়, এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। মাদরাসা হোক বা অন্য যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সর্বত্র শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ নীতিমালা, নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। টঙ্গীর ঘটনায় এখন সবার নজর পুলিশের তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে। শিশুটির গোপনীয়তা ও মানসিক সুস্থতা রক্ষা করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।

বিজ্ঞাপন