
সংসার ভাঙার খবর গ্রামে খুব দ্রুত ছড়ায়, আর সেই খবর যখন ফেসবুকে ওঠে, তখন তা আর একটি পরিবারের মধ্যে থাকে না। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার গোহট উত্তর ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামে এখন সেটাই দেখা যাচ্ছে। নেমুয়া বাড়ির শাহ আলমের মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া মিমের নিখোঁজ হওয়াকে ঘিরে থানায় দুটি জিডি হয়েছে। এলাকার চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত এ নিয়ে আলোচনা চলছে।
মিম ও কামাল হোসেন হৃদয় একই গ্রামের, দুজনের বাড়ি পাশাপাশি। স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকে চেনা এ দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০২৪ সালের ১১ অক্টোবর তাঁরা চাঁদপুরের একটি নোটারি পাবলিক কার্যালয়ে গিয়ে বিয়ের হলফনামা করেন। প্রথমে প্রেমের বিয়ে নিয়ে দ্বিধা থাকলেও পরে দুই পরিবারই বিষয়টি মেনে নেয়। তখন অনেকের ধারণা ছিল, সম্পর্কটি এবার স্থায়ী রূপ পাবে।
কিন্তু গত আগস্টে সেই ধারণায় ছেদ পড়ে। ১৮ আগস্ট মিম হঠাৎ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। স্বামী পরদিনই কচুয়া থানায় জিডি করেন। খবরটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার দুই দিন পর মিম বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। এলাকাবাসী ভেবেছিলেন, ঝামেলা বুঝি মিটে গেল। তবে কয়েক মাস পর তিনি আবার কাউকে কিছু না জানিয়ে বাড়ি ছাড়েন। এবার জিডি করেন তাঁর মা ঝরনা বেগম। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, মেয়ের কোনো খোঁজ নেই, ফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
স্বামীর বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন সুরে। কামাল হোসেন হৃদয় বলেন, তিনি ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলেন, কিন্তু বিয়ের পর থেকে স্ত্রীর আচরণ নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন জমেছে। তাঁর দাবি, মিম প্রায়ই বিভিন্ন লোকের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতেন। দ্বিতীয়বার বাড়ি ছাড়ার কিছুদিন পর তিনি ডাকযোগে একটি চিঠি পান, যাতে চাঁদপুরের নোটারি পাবলিকের কার্যালয় থেকে তৈরি তালাকের ঘোষণাপত্র ছিল। স্থানীয়রা জানান, এর আগে ঘরোয়া মনোমালিন্য মেটাতে দুই পরিবারের মধ্যে একাধিকবার সালিশ বসেছে। তবে স্বামীর এসব দাবি এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি, আর মিমের নিজের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাই মিমকে খোঁজে পাওয়া গেলে আরো বিস্তারিত ঘটনা জনা যাবে।
এ ঘটনায় একটি প্রশ্ন আইনি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে বিয়ের বৈধ নিবন্ধন হয় লাইসেন্সপ্রাপ্ত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজীর মাধ্যমে। নোটারি পাবলিকের সামনে করা হলফনামা মূলত একটি ঘোষণাপত্র, বিয়ে নিবন্ধনের বিকল্প নয়। ফলে এ ধরনের বিয়ে ভবিষ্যতে অনেক সময় জটিলতা তৈরি করে। তালাকের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। প্রচলিত আইনে তালাক কার্যকর করতে নির্ধারিত পদ্ধতি মেনে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে নোটিশ দিতে হয়। তাই ডাকযোগে পাঠানো একটি ঘোষণাপত্র আইনের চোখে কতটা কার্যকর, তা আইনজীবীদের মতে প্রশ্নসাপেক্ষ।
সমাজবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে, কম বয়সে আবেগের বশে সম্পর্ক ও বিয়ে এবং আইনি কাঠামোর বাইরে থাকা বন্ধন অনেক সময় সংকটের মুখে পড়লে দুই পক্ষকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। গ্রামীণ সমাজে একটি ঘটনার সঙ্গে দ্রুত চরিত্র নিয়ে মন্তব্য জুড়ে দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। তাই কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দশবার ভেবে নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দাম্পত্য সমস্যা দেখা দিলে চুপচাপ সরে যাওয়া বা একে অপরকে ফেসবুকে ছোট করার চেয়ে পরিবার, প্রবীণ ব্যক্তি বা পরামর্শদাতার উপস্থিতিতে খোলামেলা আলোচনা তুলনামূলক নিরাপদ ও সম্মানজনক পথ। বিয়ের নিবন্ধন করা এবং বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও সন্তানসহ ভবিষ্যৎ অধিকার ও দায়-দায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মিমের মা ঝরনা বেগমের জিডির ভিত্তিতে পুলিশ নিখোঁজ মিমকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেলে তাঁর নিজের বক্তব্য নেওয়া হবে এবং তিনি কী চান, তা জানার পর পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক হবে তা বুঝা যাবে। অনুসন্ধান শেষে নতুন কিছু জানা গেলে তা জানানো হবে।