কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) হত্যা মামলায় তার কথিত প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (১১ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী রাজুকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাজু তাজমিনকে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিষয়টি যাচাই করতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, তাজমিন হত্যা মামলার তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, মোবাইল ফোনের কললিস্ট, যোগাযোগের তথ্য এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য বিশ্লেষণ করে রাজুর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর কক্সবাজার পুলিশের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মো. অহিদুর রহমান জানান, রাজুকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। তার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু তথ্য দিয়েছেন, যেগুলো তদন্তে সহায়ক হতে পারে। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইনস্টাগ্রামে পরিচয়, এরপর যোগাযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন মাস আগে ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে তাজমিনের সঙ্গে রাজুর পরিচয় হয়। এরপর তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ চলছিল। তাজমিনের কক্সবাজার যাওয়ার পেছনেও এই যোগাযোগের ভূমিকা ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে রাগ করে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। সেখান থেকে মুঠোফোনে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাজমিন কক্সবাজার যেতে চাইলে রাজু বিকাশের মাধ্যমে তাকে ৫০০ টাকা পাঠান। এরপর তাজমিন কক্সবাজারে যান।
কক্সবাজারের ‘কক্সেস প্যানোরামিক ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর’-এর কাউন্টার প্রতিনিধি আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাত ৮টার পর তাজমিন ও রাজু কাউন্টারে যান। তারা পরদিনের জন্য ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ বাসের টিকিট সংগ্রহ করেন। ৭ অক্টোবর বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়।
হোটেলে ভিন্ন পরিচয়ে অবস্থান
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে তাজমিন ও রাজুর অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং রাজুর ঘনিষ্ঠজনদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
সূত্রের দাবি, ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে রাজু ও তাজমিন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। রেজিস্টারে তাজমিনের নাম ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়। রাজুর পরিচয়ও সেখানে ভিন্নভাবে দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে হোটেলে তাদের অবস্থানের বিষয়টি এবং সেখানে কী ঘটেছিল, তা তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করছে পুলিশ।
কুমিল্লায় ফেরার পথে যোগাযোগ ছিল রাজুর সঙ্গে
তদন্তে আরও জানা গেছে, কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর ফোনে যোগাযোগ ছিল। অটোরিকশায় ওঠার সময় তাজমিন চালকের বিষয়েও রাজুকে জানিয়েছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাজমিন অটোরিকশায় ওঠার পরও রাজুর সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন। রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের ফোনের ‘লাইভ লোকেশন’ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের তদন্তে এই সময়টিকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোবাইল ফোনের কললিস্ট, লোকেশন, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং অন্যান্য তথ্য যাচাই করে তাজমিনের শেষ অবস্থান ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সিসিটিভিতে শেষবার দেখা যায় তাজমিনকে
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামেন তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য তিনি সুমন মিয়া নামের এক চালকের সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমন তাজমিনকে রেসকোর্স এলাকার বাসায় না নিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরদিন ৮ অক্টোবর সকালে ওই এলাকার একটি ধানখেতের আইল থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় অটোরিকশাচালক সুমনকে পরে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন সুমন
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, এ মামলায় গ্রেপ্তার অটোরিকশাচালক সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশ উদ্ধার করা মোবাইল ফোনের কললিস্ট, ডিজিটাল যোগাযোগসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাজুর বক্তব্যেও এসেছে কিছু তথ্য
রাজু গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তাজমিন কুমিল্লা শহরে নিজেদের বাসায় ফিরে গিয়ে প্রধান ফটক বন্ধ দেখতে পেয়েছিলেন। পরে মা-বাবাকে ফোন করেও সাড়া না পেয়ে বিষয়টি তাকে জানান।
রাজুর দাবি, বাসায় প্রবেশ করতে না পেরে তাজমিন এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সকালে বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা জানালে তিনি তাজমিনকে ভিডিও কল করেন। সে সময় তাজমিনকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় দেখতে পান বলে দাবি করেন রাজু। পরে এ নিয়ে তিনি তাজমিনকে বকাঝকা করেছিলেন বলেও জানান।
তবে রাজুর এসব বক্তব্যের সত্যতা এবং ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, রাজুকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কুমিল্লা থেকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজারে এলে রাজুকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তাজমিনের কক্সবাজার যাওয়া থেকে শুরু করে সেখানে অবস্থান, কুমিল্লায় ফেরার পর অটোরিকশায় ওঠা, মোবাইল ফোনের শেষ যোগাযোগ এবং পরে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
তাজমিন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তবে তাজমিন হত্যা মামলায় রাজুর প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল এবং তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনোভাবে জড়িত ছিলেন কি না—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি পুলিশ। তদন্ত ও প্রমাণ যাচাই শেষে এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
