
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজধানী রিয়াদ, কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার দাবি ঘিরে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে সৌদি আরবে থাকা বিদেশিরা পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিজ দেশে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবে বসবাসরত কয়েকজন বিদেশির নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপদ ও স্থিতিশীল দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দাবি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে হুথিরা। এসব হামলায় হতাহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা ও হামলার বিস্তারিত তথ্যের কিছু অংশ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের সংঘাতে সৌদি আরবের ভূমিকা এবং সানা বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার জবাব হিসেবেই তারা এসব আক্রমণ চালিয়েছে।
বিমানবন্দরের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ও ছোটাছুটির দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মক্কায় ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রার অপেক্ষায় থাকা মানুষজনও হামলার সময় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, একপর্যায়ে বিমানবন্দরের অপেক্ষাকক্ষে ধুলা ছড়িয়ে পড়া এবং ছাদের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্যও নজরদারি ফুটেজে দেখা যায়।
পরিবারকে যুক্তরাজ্যে পাঠানোর চিন্তা
রিয়াদে সাত বছরের বেশি সময় ধরে বসবাসকারী ৩৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল সৌদি আরবে ভালো বেতনের চাকরি ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনযাপনের কারণে আপাতত দেশ ছাড়তে চান না। তবে হামলার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে থাকলে স্ত্রী-সন্তানদের যুক্তরাজ্যে পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিলালের মতে, বেসামরিক মানুষ ও ধর্মীয় সফরে থাকা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বা সামরিক বিরোধের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়া গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মত দেন তিনি।
সৌদি আরবে বিভিন্ন সময়ে প্রায় এক দশক বসবাস করা আরেক ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার সন্তানদের মধ্যেও হামলার খবর আতঙ্ক তৈরি করেছে। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু প্রবাসীর দেশে ফেরার পরিকল্পনার খবরের কারণে সন্তানদের আশ্বস্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, একসময় রিয়াদকে পরিবার নিয়ে বসবাসের নিরাপদ স্থান হিসেবে মনে হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে।
সৌদি আরবের অর্থনীতিতেও প্রভাবের আশঙ্কা
নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি হামলার প্রভাব সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, পর্যটন সম্প্রসারণ, বিনোদন খাতের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে বড় ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে দেশটির সরকার। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের সিদ্ধান্তে তার প্রভাব পড়তে পারে।
রিয়াদে একটি জ্বালানি সম্মেলনে প্রত্যাশার তুলনায় কম প্রতিনিধির উপস্থিতির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আয়োজন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ সামনে থাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশের বার্তা দেওয়া সৌদি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেন সংঘাতের পুরোনো প্রেক্ষাপট
সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাত নতুন নয়। ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর দেশটির রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে।
দীর্ঘ এই সংঘাতে ইয়েমেনে ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে পুরোনো সেই সংঘাত আবারও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং আঞ্চলিক জ্বালানি পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লে সৌদি আরবের বাণিজ্য ও জ্বালানি রপ্তানির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবসহ ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ মার্কিন অস্ত্র, সামরিক প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা কার্যকর—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রবাসীদের জন্য নতুন বাস্তবতা
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রবাসীদের দৈনন্দিন জীবন, কর্মসংস্থান, সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর।
সৌদি আরবে বসবাসরত অনেক বিদেশির কাছে চাকরি, আয় ও উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে পরিবারকে নিজ দেশে পাঠানো কিংবা সাময়িকভাবে সৌদি আরব ছাড়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তও সামনে আসতে পারে।
তবে হামলার খবরের ভিত্তিতে সৌদি আরবের সব অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি একই রকম—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রবাসীদের জন্য নিজ নিজ দেশের দূতাবাসের নির্দেশনা, সৌদি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা সতর্কতা এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসরণ করাই গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরবের পরিস্থিতি আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে যায়, তার ওপরই অনেক প্রবাসী পরিবার তাদের পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।