রাজধানীর ন্যাম ভবনে সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের প্রাণহীন দেহ উদ্ধারের পর থেকে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ৫ নম্বর ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে তরুণীর নিথর দেহ উদ্ধারের ঘটনাটি নিছক সে নিজেকে নিজে শেষ করেছে নাকি পরিকল্পিত অপরাধ, তা নিয়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মরিয়মের কক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া একাধিক আবেগঘন চিরকুট এবং বিয়ের কাবিননামা সংক্রান্ত আগের বিতর্ককে কেন্দ্র করে ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরতে শুরু করেছে।
২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পুলিশ ও সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ন্যাম ভবন থেকে মরিয়ম খাতুনের দেহ উদ্ধার করে। নিহতের কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় একাধিক চিরকুট, যেখানে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, প্রতারণা ও বিশ্বাসের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত রয়েছে। একটি চিরকুটে লেখা ছিল— 'শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই… তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…।' অন্য একটি লেখায় ছিল— 'আমি হেরেছি তুমি জিতেছো, কারণ আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো।'
চিরকুটগুলোতে ভালোবাসার ভাগ না দেওয়া এবং একজন বিবাহিত পুরুষকে বিশ্বাস করার আক্ষেপ স্পষ্ট হলেও, পুলিশ জানিয়েছে—এগুলো সত্যিই মরিয়মের নিজ হাতে লেখা কি না বা এই মর্মান্তিক পরিণতির পেছনে প্ররোচনার প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা আদালতের বিচারিক ও হস্তলেখা বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
মামলা, রিমান্ড ও রাজনৈতিক প্রভাব ঘটনার পর মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় নিজেকে নিজে শেষ করে দেওয়ার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। এতে সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়। মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদাকে গ্রেপ্তার করে। ২১ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত শুনানি শেষে গাজী নজরুলের চার দিন এবং তার স্ত্রী মাকছুদা বেগমের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেখিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া চিরকুটের নিরপেক্ষ তদন্ত ও হাতের লেখা বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা করলেই এই করুন পরিণতির পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, ঘটনাটি একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা মাত্র এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাবেক সংসদ সদস্যকে হয়রানি করার জন্য মামলায় জড়াচ্ছে পুলিশ।
মিথ্যা কাবিননামা ও চিরকুটের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে মরিয়মের বিয়ের বৈধতা এবং সম্পর্কের শুরু নিয়ে। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে পরিচয়ের পর সম্পর্কের সূত্রপাত এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুনে গোপনে বা তড়িঘড়ি করে বিয়ের দাবি উত্থাপন নিয়ে চরম অসঙ্গতি দেখা গেছে। এর আগে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে জাল কাবিননামা ও ভুয়া বিয়ের ফাঁদ তৈরি করার অভিযোগ উঠেছিল, যার জের ধরে কিছুদিন আগেই ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় নৈতিক স্খলনের অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে।
সামাজিক মাধ্যমে এবং জনমনে এখন বড় প্রশ্ন—যে ব্যক্তি পূর্বে মিথ্যা আশ্বাস ও কাবিননামা বিতর্কে জড়িত ছিলেন, সেখানে উদ্ধারকৃত চিরকুটগুলোও কি মরিয়মের নিজের, নাকি তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর ঘটনা অন্য খাতে মোড় নিতে বা কাউকে আড়াল করতে তৈরি করা কোনো সাজানো নথি? এই চিরকুটের পেছনে কোনো জালিয়াতি বা অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ছিল কি না, তা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অন্যতম প্রধান খতিয়ে দেখার বিষয়।
তদন্ত ও অপরাধের মাত্রা
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মতে, ক্ষমতার সর্বোচ্চ জায়গায় থাকা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির মাধ্যমে চাকরির লোভ দেখানো, পরে দ্বিতীয় স্ত্রীর রূপ দিয়ে এক ছাদের নিচে রাখা এবং মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ অত্যন্ত গম্ভীর। এটি যদি নিজের সিদ্ধান্তেও জীবনাবসান হয়ে থাকে, তবুও এর পেছনে ক্রমাগত প্ররোচনা, হুমকি ও চাপ ছিল কি না—তা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে না দেখলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত সম্ভব নয়।
বর্তমানে পুলিশ, সিআইডি এবং হস্তলেখা বিশেষজ্ঞ দল উদ্ধার হওয়া চিরকুট, নিহত ও আসামিদের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR), এবং ন্যাম ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছে। এই বিস্তৃত তদন্তের পরেই প্রকাশ পাবে—১৯ বছরের মরিয়মের এই করুণ পরিণতি নিছক কোনো পারিবারিক বিরোধের জের, নাকি সাজানো কোনো গভীর ষড়যন্ত্র।
