সারাবাংলা

পোস্ট লোড হচ্ছে...

আন্তর্জাতিক

পোস্ট লোড হচ্ছে...

মানিকগঞ্জে ব্যাটারি চুরিতে বাধা দেওয়ায় জামাইয়ের লাথিতে শ্বশুরের মৃত্যু, আটক ১

বিশেষ প্রতিনিধি, মানিকগঞ্জ: মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। নিজ শ্বশুরবাড়িতে ব্যাটারি চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে জামাই। এ সময় চুরির প্রতিবাদ করলে শ্বশুরের পেটে ও বুকে সজোরে লাথি মারেন অভিযুক্ত জামাই। লাথির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ঘটনাস্থলেই এক অটোচালকের মৃত্যু হয়। নিহত ব্যক্তির নাম সিদ্দিক আলী (৪৮)।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দিনগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গড়পাড়া ইউনিয়নের সাকরাইল ৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এই লোমহর্ষক ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত জামাই রাসেলকে (২৭) স্থানীয় জনতা আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে।

নিহত সিদ্দিক আলী সাকরাইল এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত অটোচালক ও মেকানিক ছিলেন। তার এই অকাল ও নির্মম মৃত্যুতে পরিবারসহ পুরো এলাকায় গভীর শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য

পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, রোববার গভীর রাতে সিদ্দিক আলীর বসতবাড়ির উঠানে থাকা ‘হ্যালো বাইক’ (এক ধরনের ব্যাটারিচালিত গাড়ি)-এর ব্যাটারি চুরির চেষ্টা চলছিল। রাত আনুমানিক ২টার দিকে খটখট শব্দ পেয়ে সিদ্দিক আলীর ছেলে ঘর থেকে বের হয়। সে দেখতে পায় যে একদল চোর গাড়ির ব্যাটারি খুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। চোর দেখে সে তাৎক্ষণিক চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে।

ছেলের চিৎকার শুনে পরিবারের সদস্য এবং আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে চোরকে ধাওয়া দিয়ে আটক করেন। তবে আটকের পর চোরকে দেখে পরিবারের সদস্যরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। ব্যাটারি চুরির সময় হাতেনাতে আটক হওয়া ব্যক্তি অন্য কেউ নন—নিহত সিদ্দিক আলীর নিজের মেজো মেয়ের জামাই রাসেল।

ব্যাটারি চুরির মতো জঘন্য অপরাধে নিজের জামাইকে যুক্ত থাকতে দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন সিদ্দিক আলী। তিনি জামাই রাসেলের এমন ন্যক্কারজনক কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং শাসন করার চেষ্টা করেন। এ সময় জামাই ও শ্বশুরের মধ্যে তীব্র কথা-কাটাকাটি ও বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। নিজের অপকর্ম ঢাকা ও পালানোর উদ্দেশ্যে রাসেল একপর্যায়ে উগ্র রূপ ধারণ করে। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে জামাই রাসেল তার শ্বশুর সিদ্দিক আলীকে লক্ষ করে সজোরে লাথি মারেন।

লাথির আঘাত সরাসরি সিদ্দিক আলীর শরীরে লাগলে তিনি সাথে সাথেই বিকট শব্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং প্রচণ্ড ব্যথায় ছটফট করতে থাকেন। পরিবারের সদস্যরা ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সিদ্দিক আলীকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী বাবুল মিয়া বলেন, "গভীর রাতে চিৎকার-চেঁচামেচির শব্দ শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং দ্রুত বাইরে আসি। এসে দেখি সিদ্দিক আলী ও তার জামাই রাসেলের মধ্যে প্রচণ্ড চিৎকার ও তর্কাতর্কি চলছে। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ রাসেল তার শ্বশুরকে সজোরে একটি লাথি মারে। লাথি খাওয়ার সাথে সাথে সিদ্দিক আলী মাটিতে ঢলে পড়েন। তাকে উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ সদরের হাসপাতালে নেওয়া হলে ডাক্তার বলেন তিনি আর বেঁচে নেই। নিজের জামাইয়ের হাতে এভাবে একজন মানুষ মারা যাবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি।"

নিহতের স্ত্রীর কান্না ও স্বজনদের দাবি

স্বামীর এই আকস্মিক ও নির্মম হত্যাকাণ্ডে পাগলপ্রায় নিহতের স্ত্রী রুনা বেগম। তিনি কেঁদে কেঁদে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, "আমার ছেলে রাতে প্রথম চুরির বিষয়টি টের পায়। ও চিৎকার করে বলে যে ঘরের বাইরে থেকে আমাদের হ্যালো বাইকের ব্যাটারি চুরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা সবাই মিলে দৌড়ে গিয়ে চোরকে হাতেনাতে আটক করি। আলো জ্বালিয়ে দেখি চোর আর কেউ নয়, আমাদেরই জামাই রাসেল! নিজের জামাইকে চোর হিসেবে দেখে আমার স্বামী তাকে ধমক দেয় এবং জিজ্ঞাসা করে সে কেন এই কাজ করল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাসেল কোনো কিছু না ভেবেই আমার স্বামীকে সজোরে লাথি মারে। লাথি খেয়ে আমার স্বামী মাটিতে পড়ে গিয়ে আর কথা বলতে পারেনি।"

রুনা বেগম আরও বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করে জানান, এই চুরির ঘটনায় রাসেল একা ছিল না। তার সাথে সংঘবদ্ধ চোরচক্রের আরও দুই সদস্য ছিল। রুনা বেগম বলেন, "ঘটনার সময় রাসেলের সাথে আরও দুজন সহযোগী উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে একজনের নাম শাওন বলে আমরা জানতে পেরেছি। সুযোগ বুঝে রাসেলের সহযোগীরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।"

শ্বশুরকে হত্যার বিচার চেয়ে নিহতের স্ত্রী আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, "যে জামাই নিজের শ্বশুরের ঘরে চুরি করতে আসে এবং বাধা দেওয়ায় নিজের হাতে শ্বশুরকে হত্যা করে, তার কোনো ক্ষমা হতে পারে না। আমি রাসেলসহ এই ঘটনার সাথে জড়িত পলাতক শাওন এবং অন্য সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তির (ফাঁসি) দাবি জানাচ্ছি।"

অভিযুক্তকে আটক ও পুলিশের বক্তব্য

ঘটনার পরপরই উত্তেজিত স্থানীয় জনতা অভিযুক্ত রাসেলকে ধরে গণধোলাই দেয়। পরে খবর পেয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রাসেলকে আটক করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন সংবাদ মাধ্যমকে জানান, "ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত জামাই রাসেলকে আমরা আটক করেছি। তবে চুরির পর শ্বশুরকে লাথি মারা ও মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে মারধর করে। স্থানীয়দের গণধোলাইয়ে রাসেল আহত হওয়ায় তাকে বর্তমানে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।"

ওসি মনির হোসেন আরও জানান, নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। "ময়নাতদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর সিদ্দিক আলীর মৃত্যুর মূল কারণ (আঘাতজনিত নাকি হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে) সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ছাড়া নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এই ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে চলছে।"

এলাকায় শোক ও চাঞ্চল্য

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত সিদ্দিক আলী কঠোর পরিশ্রম করে সংসার চালাতেন। দিন আনে দিন খাওয়া এই অটোচালকের অকাল মৃত্যুতে তার পরিবারটি এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। একজন মেয়ের জামাই কীভাবে নিজের শ্বশুরের বাড়িতে চুরি করতে পারে এবং চুরির প্রতিবাদ করায় নিজ শ্বশুরকে নির্মমভাবে হত্যা করতে পারে—তা ভেবে শিউরে উঠছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

গড়পাড়া ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সদস্যরা জানান, রাসেলের আচরণ আগে থেকেই কিছুটা পথভ্রষ্ট ছিল। তবে সে যে এত বড় অপরাধ ঘটাতে পারে তা কারো ধারণায় ছিল না। সাকরাইল গ্রামে এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং স্থানীয়রা এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।


বিজ্ঞাপন