অনলাইন ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের মূল্যে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি দেখা দেয়। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি পরিস্থিতি তৈরি করে। পূর্ববর্তী বছরগুলোর ডলার সংকট এবং অপেক্ষাকৃত কম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রেক্ষাপটে দেশের অর্থনীতির ওপর নতুন করে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে সমস্ত প্রতিকূলতা ও অর্থনৈতিক চাপ সামলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা লক্ষ করা গেছে, যা বৈদেশিক খাতের জন্য কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দেশের মোট রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার। জুনে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৭.৫৭ বিলিয়ন ডলারে। পরবর্তী সময়ে রিজার্ভ ৩৬ থেকে ৩৭ বিলিয়ন ডলারের সীমানাতেই অবস্থান করছে। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) 'বিপিএম-৬' (BPM-6) হিসাব পদ্ধতি অনুসরণ করলে বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য নিট রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩১.৫ বিলিয়ন ডলার, তবুও চলমান বিশ্বমন্দার নিরিখে এটি একটি স্থিতিশীল অবস্থান নির্দেশ করে।
জ্বালানি ও সারের আমদানিতে ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র
দেশের লেনদেনের ভারসাম্যের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানির পেছনে বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হয়েছে। এক বছরে তেল আমদানির পেছনে খরচ ১০৭ শতাংশ বেড়ে ১০.৬৪ বিলিয়ন ডলারে উঠে এসেছে। একইভাবে সার আমদানির পেছনে খরচ ৪২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৭২ বিলিয়ন ডলারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু এই দুটি মৌলিক পণ্যের পেছনেই পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৬.৬ বিলিয়ন (৬৬০ কোটি) ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়েও এই ধারা অব্যাহত রেখে জ্বালানি তেল ও সার আমদানিতে বাংলাদেশ ১.৫৬২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের (৮৭৫ মিলিয়ন ডলার) তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা এসেছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (LNG) আমদানির ক্ষেত্রে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ মোট ১১২টি এলএনজি কার্গো আমদানি করেছে, যার মধ্যে ৪৯টি কেনা হয়েছে স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে। সংঘাত শুরুর পর স্পট মার্কেটে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBtu) এলএনজির দাম ১২-১৩ ডলার থেকে বেড়ে ২৪ থেকে ২৮ ডলারে পৌঁছায়। এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকি বার্ষিক ৬ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪,৫০০ কোটি টাকায়। আগামী অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানির ঘাটতি মেটাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা (৩.৩ বিলিয়ন ডলার) প্রয়োজন হবে বলে জ্বালানি বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে।
রিজার্ভ ও বৈদেশিক খাত ঘুরে দাঁড়ানোর কারণ
নানা দিক থেকে বৈশ্বিক ব্যয়ের চাপ বাড়লেও দেশের সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত দ্বিগুণ হয়ে ৬.৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে, বেশ কয়েকটি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক অর্থনৈতিক সূচকের সমন্বয়ে রিজার্ভের এই স্বস্তি অর্জিত হয়েছে:
১. রেমিট্যান্সের রেকর্ড আগমন: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন উভয়েই রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের অভাবনীয় বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছেন। গত অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ পূর্বের বছরের চেয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বেড়েছে। বিগত ডিসেম্বর থেকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বা তার কাছাকাছি রেমিট্যান্স দেশে এসেছে, যা মার্চে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। মূলত অবৈধ পথে অর্থ পাচার রোধে কড়াকড়ি এবং টাকার বিনিময় হার নির্দিষ্ট রাখার সরকারের নীতির কারণে প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন।
২. নন-ফুয়েল পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ: জ্বালানি ও সার বাদ দিলে অর্থনীতিতে অন্যান্য সাধারণ পণ্যের আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ছিল। তথ্যানুযায়ী, আগের অর্থবছরে পেট্রোলিয়াম ও সার বাদে সামগ্রিক আমদানি ছিল ৬০.৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরে সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০.৮৮ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, জ্বালানি ব্যতিরেকে অন্যান্য বিলাসবহুল বা অ-জরুরি মূলধনি পণ্যের আমদানি কমানোর ফলে বাজারে অতিরিক্ত ডলারের চাহিদা তৈরি হয়নি।
৩. বাণিজ্য ঋণের হিসাব ও বকেয়া পাওনা আদায়: আর্থিক হিসাবের ক্ষেত্রে নিট বাণিজ্য ঋণের সমন্বয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। আগের বছরের ৩.১৫ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতির জায়গায় গত অর্থবছরে ৩.০৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরে নতুন করে রপ্তানি না বাড়লেও পূর্ববর্তী বছরের রপ্তানির বকেয়া অর্থ দেশে প্রবেশ করায় সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কিছু জ্বালানি আমদানির দায় সরাসরি পরিশোধ না করে বায়ার্স ক্রেডিটের (Buyer's Credit) মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের সুযোগ নেওয়ায় তাৎক্ষণিক চাপ কমেছে।
৪. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি ডলার ক্রয়: রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বাবদ দেশে আসা অতিরিক্ত ডলার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ক্রয়ের কৌশল নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। নিলামের মাধ্যমে গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বাজার থেকে কিনে নিয়ে সরাসরি রিজার্ভে যোগ করেছে। সর্বশেষ নিলামগুলোতে প্রতি ডলারের সর্বনিম্ন দর ১২২.৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২২.৭৫ টাকা নির্ধারণ করে ব্যাংকগুলোকে উদ্বৃত্ত ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে বাধ্য করা হয়।
ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও করণীয়
পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান কৌশল দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে এই রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। বায়ার্স ক্রেডিটের মাধ্যমে স্থগিত রাখা জ্বালানি আমদানির বিল ভবিষ্যতে সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে, যা আর্থিক প্রবাহে টান ফেলতে পারে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক বিপুল পরিমাণ ডলার কেনার ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে মুদ্রাস্ফীতির ওপর বিপরীত প্রভাব ফেলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, রেমিট্যান্সের এই বর্তমান সুফল ধরে রাখতে হলে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। শুধু বৈদেশিক মুদ্রার দর ধরে রেখে রেমিট্যান্স বাড়ানো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়; বরং টেকসই প্রবাসী আয়ের জন্য বিদেশগামী জনশক্তির পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে ্যগত বাজারের বাইরে নতুন নতুন বৈশ্বিক শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও তৈরি করতে হবে।কমা দিয়ে
