সারাবাংলা

পোস্ট লোড হচ্ছে...

আন্তর্জাতিক

পোস্ট লোড হচ্ছে...

নারীসহ অন্তরঙ্গ অবস্থায় নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা আটক: গণধোলাইয়ের পর গাছে বাঁধল জনতা

রংপুর প্রতিনিধি: রংপুরের বদরগঞ্জে এক নারীর সাথে আপত্তিকর ও অন্তরঙ্গ অবস্থায় নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতা এস কে ফুলবাবু সরকারকে (২৪) আটক করেছে স্থানীয় জনতা। গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বদরগঞ্জ পৌর শহরের চাঁদকুঠির ডাঙ্গা এলাকার একটি বসতবাড়িতে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তাঁদের উভয়কে বাড়ির উঠানে গাছের সাথে বেঁধে রাখে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

ঘটনার পটভূমি ও বিস্তারিত বিবরণ

পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, আটক নারী পেশায় স্থানীয় একটি ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সঞ্চয়ী সমিতির মাঠকর্মী হিসেবে কর্মরত। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর বদরগঞ্জ পৌর শহরের চাঁদকুঠির ডাঙ্গা এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে একাকী বসবাস করছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, ওই নারী একা থাকার সুবাদে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর বাড়িতে নানা অসামাজিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। এ নিয়ে প্রতিবেশী ও এলাকাবাসীর মনে দীর্ঘদিন ধরে চাপা অসন্তোষ ও সন্দেহ বিরাজ করছিল।

অন্যদিকে, আটক ছাত্রলীগ নেতা এস কে ফুলবাবু সরকার বদরগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বুজরুক হাজিপুর খিয়ারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। বিগত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ফুলবাবু আত্মগোপনে ছিলেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

হাতেনাতে আটক ও গাছে বেঁধে রাখার ঘটনা

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে এবং ২১ সেপ্টেম্বরের প্রথম প্রহরে ছাত্রলীগ নেতা ফুলবাবু সরকার গোপণে ওই নারীর বাড়িতে প্রবেশ করেন। গভীর রাতে এক অপরিচিত ও আত্মগোপনে থাকা যুবককে ওই বাড়িতে ঢুকতে দেখে সন্দেহ হয় আশপাশের প্রতিবেশীদের।

তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় বেশ কয়েকজন যুবক ও এলাকাবাসী একজোটে বাড়িটি ঘেরাও করেন। একপর্যায়ে তাঁরা ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে দুজনকে আপত্তিকর ও অত্যন্ত অন্তরঙ্গ অবস্থায় হাতেনাতে ধরে ফেলেন। দীর্ঘদিনের জমানো ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে এলাকাবাসীর মধ্যে। ক্ষুব্ধ জনতা এ সময় চড়-থাপ্পড় দেওয়ার পাশাপাশি অসামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ হিসেবে ফুলবাবু এবং ওই নারীকে ঘরের বাইরে নিয়ে এসে উঠানের একটি গাছের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে রাখেন।

ঘটনার খবর মুহূর্তের মধ্যে পুরো বদরগঞ্জ পৌর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। রাত হওয়া সত্ত্বেও শত শত উৎসুক জনতা দুজনকে গাছে বাঁধা অবস্থায় দেখতে ওই বাড়িতে ভিড় জমায়। উপস্থিত জনতার অনেকেই ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই ভাইরালে পরিণত হয়।

অভিযুক্তের জবানবন্দি ও আত্মপক্ষ সমর্থন

গাছে বাঁধা অবস্থায় উপস্থিত জনতা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে অভিযুক্ত ফুলবাবু সরকার স্বীকার করেন যে, আটক নারীর সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় এবং গভীর প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে।

ফুলবাবু জানান, বিগত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি চরম নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকিতে পড়েন। প্রাণভয়ে ও গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে রাজধানী ঢাকায় চলে যান। ঢাকায় গিয়ে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় জীবনধারণের জন্য তিনি একটি হোটেলে চাকরি নেন। তিনি দাবি করেন, সম্প্রতি তিনি গোপন কাজে বদরগঞ্জে ফেরেন এবং গভীর রাতে প্রেমিকার সাথে দেখা করতে ওই বাড়িতে এসেছিলেন। তবে প্রেম ও সম্পর্কের দাবি করলেও গভীর রাতে অনৈতিক অবস্থায় স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ার কথা তিনি অস্বীকার করতে পারেননি।

এলাকার বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা আবুজার গিফারী মন্টু ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, "উক্ত নারী স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর থেকেই এখানে একা বসবাস করে আসছিলেন। তবে তাঁর চলাফেরা ও বাড়িতে অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবেশীরা সন্দেহ করছিলেন। আমাদের কাছে সুস্পষ্ট তথ্য ছিল যে তিনি বাড়িতে অনৈতিক ও অসামাজিক কাজ পরিচালনা করছিলেন। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর অসন্তোষ চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। গত রাতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা ফুলবাবু গোপনে ওই ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই সবাই মিলে ধাওয়া দিয়ে হাতেনাতে আটক করে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং শিক্ষার স্বার্থে জনগণ তাঁদের গাছে বেঁধে রেখে পুলিশকে খবর দেয়।"

এলাকার একাধিক প্রবীণ ব্যক্তি জানান, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক দল হিসেবে ছাত্রলীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলেও ফুলবাবুর মতো কর্মীরা গোপনে অসামাজিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিল। রাজনীতি ও অনৈতিকতার এই অপকর্মগুলোকে বরদাশত করা হবে না বলেই জনতা একত্রিত হয়ে তাঁদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।

পুলিশি পদক্ষেপ ও আইনি প্রক্রিয়া

ঘটনার খবর পেয়ে বদরগঞ্জ থানা পুলিশের একটি টহল দল দ্রুত চাঁদকুঠির ডাঙ্গা এলাকার ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং গাছে বাঁধা অবস্থায় ছাত্রলীগ নেতা ফুলবাবু সরকার ও ওই নারীকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।

বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরদার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, "অন্তরঙ্গ অবস্থায় হাতেনাতে ধরা পড়ার পর উত্তেজিত জনতা দুজনকে গাছে বেঁধে রেখেছিল। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।"

ওসি হাসান জাহিদ সরদার আরও তথ্য প্রদান করে বলেন, "আটক ছাত্রলীগ নেতা এস কে ফুলবাবু সরকারের বিরুদ্ধে আগের একটি সহিংসতা ও রাজনৈতিক মামলা রুজু ছিল। ৫ আগস্টের পর থেকেই সে পলাতক ছিল। আগের সেই পুরোনো মামলাতেই তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে। এছাড়া, ওই নারীসহ অনৈতিক ও আপত্তিকর অবস্থায় স্থানীয়দের হাতে ধরা পড়ার ঘটনায় তাঁদের উভয়ের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অসামাজিক কার্যকলাপ ও স্থানীয় শান্তিশৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"

সার্বিক পরিস্থিতি ও জনমনে প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বদরগঞ্জ উপজেলা শহর ও আশপাশের এলাকাগুলোতে ব্যাপক আলোচনা ও গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যেমন নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের নেতার আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় অসামাজিক কাজে জড়িত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে অপরাধীদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য সচেতন মহল সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সমাজ থেকে অসামাজিক কর্মকাণ্ড নির্মূলে কেবল পুলিশের সাময়িক গ্রেপ্তার যথেষ্ট নয়; বরং এ ধরনের ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সে জন্য দোষীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করতে হবে। বর্তমানে বদরগঞ্জ থানা পুলিশ পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী আসামিদের আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে।


বিজ্ঞাপন