
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৩) হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর ও নেপথ্যের নানা তথ্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। নিহতের হাতে থাকা আইফোনের প্রতি লোভ এবং গভীর রাতে একা পেয়ে সিএনজিচালক মো. সুমন একাই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় চট্টগ্রাম থেকে প্রধান অভিযুক্ত সিএনজিচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করে পুলিশ।
পরিবারের পরিচয় ও বসবাস
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা (বা চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা) গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন এবং সেই সুবাদে পরিবার নিয়ে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর নিয়মিত স্কুলে যেত না। গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে সে বাসা থেকে বের হয়েছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজার যাতায়াত এবং সিসিটিভি ফুটেজ
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল তাজমিন বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে গেছে, কিন্তু পরবর্তীতে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানতে পারে যে সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল এবং পরদিন কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নূরজাহান হোটেলের সামনে এসে নামে তাজমিন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে বাস বা গাড়ি থেকে একা নামতে দেখা যায়। এরপর হোটেলের আশপাশের বিভিন্ন ক্যামেরার ফুটেজে তার হাতে মোবাইল ফোন এবং কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে একা ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে সে সড়কের দিকে চলে যায় এবং এরপর তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো আর কোনো দৃশ্যমান সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তাজমিন কেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বা কক্সবাজারে গিয়েছিল এবং সেখানে কার সঙ্গে দেখা করেছিল বা কুমিল্লায় ফেরার পর আর কার কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, তা নিয়ে গভীর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বাবার কাছে লাইভ লোকেশন প্রেরণ
নিখোঁজ হওয়ার পর তাজমিনের পরিবারের সদস্যরা গভীর উৎকণ্ঠায় দিন কাটান। নিখোঁজ থাকা অবস্থায় ঘটনার আগের রাতে (বুধবার রাত ২টা ৫৮ মিনিটে) তাজমিন তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে দ্রুত সেখান থেকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে একটি বার্তা পাঠায়। তবে তার বাবা তখন গভীর ঘুমে থাকায় সেই বার্তাটি দেখতে পাননি। পরদিন সকালে সেই লোকেশন ও বার্তা চেক করতে গিয়েই মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের মর্মান্তিক খবর পান তিনি।
আইফোনের লোভ ও হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, কুমিল্লা শহরের রেসকোর্সের বাসায় ফেরার জন্য গভীর রাতে একা ওই সিএনজি অটোরিকশায় ওঠেন তাজমিন। তখন তার হাতে থাকা দামি আইফোনটি দেখতে পায় চালক মো. সুমন। সুমন মাদকাসক্ত অবস্থায় সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন। শহরের নির্দিষ্ট গন্তব্যের পথে না গিয়ে তিনি ভিন্ন ও নির্জন একটি পথের দিকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যান।
গত ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করে পুলিশ। অটোরিকশার নিবন্ধন যাচাই করে এর মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি জানান যে গাড়িটি ভাড়ায় চালাতেন মো. সুমন। সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা হলেও কয়েক বছর আগে বিয়ে করে লালমাইয়ের বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস করতেন। তবে ঘটনার প্রায় এক মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে তিনি শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে যান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি গিয়ে ধানখেতের পাশে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের ধানক্ষেতে ব্যাপক ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির স্পষ্ট আলামত দেখতে পান তারা। স্থানীয়দের ধারণা, হামলাকারী বা চালকের হাত থেকে বাঁচতে তাজমিন জীবন বাঁচাতে ধানক্ষেতের মধ্যে পালানোর চেষ্টা করেছিল এবং তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। পরবর্তীতে জমিতে থাকা সেই আলামত ও পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করে সামনের একটি ধানক্ষেতে তার মরদেহ দেখতে পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন স্থানীয়রা।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের শরীরে পোশাক না থাকা অবস্থায় গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এছাড়া হত্যার আগে কিশোরীটি কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য ময়নাতদন্তের মেডিকেল প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে পুলিশ। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর শুক্রবার তাজমিনের মরদেহ গ্রামের বাড়ি যশোরে নিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার, আইফোন উদ্ধার এবং পুলিশের প্রেস ব্রিফিং
তদন্তের অংশ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম থেকে প্রধান অভিযুক্ত সিএনজিচালক মো. সুমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন বিকেলে তাজমিনের ব্যবহৃত সেই আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান জানান, শুক্রবার বিকেলে সুমনকে কুমিল্লায় নিয়ে আসা হয় এবং জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক দল এই বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য, কললিস্ট, সিসিটিভি ফুটেজ এবং গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। হত্যাকাণ্ডে সুমন সরাসরি ও একা জড়িত থাকলেও, তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনায় আরও একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য ও চূড়ান্ত অগ্রগতি জানানোর জন্য শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ১০টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পুলিশ।