জাতীয়

জাতীয় :3

রাজনীতি

রাজনীতি :3

রাজধানী

রাজধানী :3

সারাবাংলা

সারাবাংলা :6

আন্তর্জাতিক

আন্তর্জাতিক :3

অপরাধ

অপরাধ :3

প্রবাস

প্রবাস :3

তথ্যপ্রযুক্তি

তথ্যপ্রযুক্তি :3

মাছরাঙা টিভির ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল ভিডিওর পেছনে আসল সত্য কী? মুখ খুললেন পরীমনি

অনলাইন ডেস্ক প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মূলধারার গণমাধ্যম মাছরাঙা টেলিভিশনের ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে সেখানে অশ্লীল ও বিকৃত ভিডিও প্রকাশের ঘটনা দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। জনপ্রিয় দুই অভিনেত্রী পরীমনি ও মেহজাবীন চৌধুরীকে জড়িয়ে প্রচারিত এসব ভিডিওকে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ফেস সোয়াপ প্রযুক্তিতে তৈরি ভুয়া ভিডিও বলে শনাক্ত করেছে। ঘটনার পর পরীমনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও বার্তায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

যেভাবে ঘটল ঘটনা

সোমবার রাতে মাছরাঙা টেলিভিশনের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়। এরপর সেখানে দুই অভিনেত্রীর বিকৃত ভিডিওসহ মোট পাঁচটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়। মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত পোস্টগুলো অ্যাকাউন্টে দৃশ্যমান ছিল।

প্রকাশের পর ভিডিওগুলো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভিউ পায়। একটি ভিডিও দেখা হয় ১ লাখ ৫৫ হাজার বার, অন্যটি ১ লাখ ৪৭ হাজার বার। প্রথম ভিডিওতে ১ হাজার ৩০০টির বেশি প্রতিক্রিয়া ও ১ হাজার ১৮১টি মন্তব্য পড়ে। দ্বিতীয়টিতে প্রতিক্রিয়া পড়ে ১ হাজার ৪০০টির বেশি, মন্তব্য ২০০টিরও বেশি।

একটি মূলধারার গণমাধ্যমের যাচাইকৃত অ্যাকাউন্টে এ ধরনের কনটেন্ট দেখে ব্যবহারকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়। মন্তব্যের ঘরে অনেক অনুসারী বিস্ময় প্রকাশ করেন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

অ্যাকাউন্ট হ্যাকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মাছরাঙা টেলিভিশনের মাল্টিমিডিয়া ম্যানেজার মাহমুদুল রুবেল। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ।

কর্তৃপক্ষের দাবি, হ্যাকাররা মোট পাঁচটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে একটিতে পরীমনি এবং আরেকটিতে মেহজাবীন চৌধুরীর নাম জড়ানো হয়। বাকি তিনটি ভিডিও নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ঘটনা জানাজানি ও ব্যাপক সমালোচনার পর কর্তৃপক্ষ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে ভিডিওগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।

মুছে ফেলার পরও ছড়িয়ে পড়ছে

ভিডিও মুছে ফেলা হলেও তার আগেই একাংশ নেটিজেন সেগুলো ডাউনলোড করে রাখেন। অভিযোগ উঠেছে, তাঁরা এখন সেই ভিডিও ও লিংক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত ভাইরাল করছেন। ফলে ক্ষতির পরিধি অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধারের পরও থামেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের কনটেন্ট ছড়ানো বা শেয়ার করাও একটি অপরাধ।

ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে যা পাওয়া গেছে

ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারসহ সংশ্লিষ্টদের যাচাইয়ে ভিডিওগুলো সম্পূর্ণ ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ফেস সোয়াপ বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অন্য একটি ভিডিওর ওপর দুই তারকার মুখ বসিয়ে এসব কুরুচিপূর্ণ ও সম্পাদিত ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। অনলাইনে ছড়ানো তথাকথিত "ভাইরাল লিংক" বা ভিডিওগুলোর কোনো বাস্তব সত্যতা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলধারার একটি গণমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এ ধরনের ডিপফেক ছড়ানো সুপরিকল্পিত সাইবার অপরাধ। এর লক্ষ্য ছিল ভিডিওগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা এবং তারকাদের সম্মানহানি করা।

পরীমনির প্রতিক্রিয়া

ঘটনার পর ১৭ অক্টোবর রাত ২টায় নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভিডিও বার্তা দেন পরীমনি। বক্তব্যের মূল দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

 পরীমনি বলেন, ভিডিওগুলো এআই-সৃষ্ট বা এডিট করা ভুয়া কনটেন্ট। তিনি জানান, এই ভুয়া ভিডিওটি এক থেকে দেড় বছর আগেই তাঁর চোখে পড়েছিল এবং অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পাঠিয়েছিলেন।

তাঁর অভিযোগ, মানুষ কোনো সত্যতা যাচাই না করেই এসব কনটেন্ট বিশ্বাস করে এবং বিচার করতে শুরু করে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও একশ্রেণির মানুষ কুরুচিপূর্ণ গুজবে সহজেই বিভ্রান্ত হয়। ভুয়া বিষয়কে অনেক সময় সত্য বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, যা একজন শিল্পীর ব্যক্তিজীবন ও সুনামের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 পরীমনির দাবি, কিছু মানুষ অনলাইনে শুধু অপপ্রচার চালানো ও ভুয়া লিংক ছড়ানোর সুযোগ খোঁজে। এমনকি ফেসবুকে ধর্মীয় বা সাধারণ পোস্টের নিচেও কেউ কেউ “পরীমনির লিংক আছে আমার কাছে” এ ধরনের মন্তব্য করে। তাঁর মতে, একটু বুদ্ধি খাটালেই বোঝা যায় এগুলো মিথ্যা এবং এআই বা এডিটিংয়ের ফল।

পরীমনি বলেন, এ ধরনের ভুয়া কনটেন্ট বানানো এখন খুব সহজ, যাঁরা ভিডিও ছড়াচ্ছেন বা উপভোগ করছেন, তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তিরা নিজেদের মায়ের ছবি দিলে তিনি নিজেই তা দিয়ে এ ধরনের কনটেন্ট বানিয়ে দিতে পারবেন। বক্তব্যটি তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে দিয়েছেন। এ মন্তব্যকে অনেকে আপত্তিকর ও অশালীন বলে সমালোচনা করছেন।

বক্তব্যের বড় অংশে পরীমনি আক্রমণাত্মক ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করেন। সমালোচকদের তিনি ‘গাধা’, ‘গাধার বাচ্চা’সহ নানা গালি দেন। তাঁদের পরিবার, বিশেষ করে মা-বাবাকে নিয়ে তিনি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ আপত্তিকর মন্তব্যও করেন। তিনি বলেন, ভুয়া জিনিস নিয়ে যাঁরা জীবন আটকে ফেলেছেন, তাঁদের নিজের জীবনে মনোযোগ দেওয়া উচিত। গালি দেওয়ার অধিকার নিয়েও তিনি বলেন, বাঙালি হিসেবে গালি শুধু অন্যরা দেবে, তিনি দেবেন না, এমন নয়। তিনিও গরু খান তাই তিনিও গালি দিতে পারেন।

 ক্ষোভের মধ্যে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেন, সমালোচকরা এত আগ্রহ নিয়ে দেখতে চাইলে তিনি কেন বিকিনি, স্বচ্ছ পোশাক বা ‘ন্যুড’ শুট করবেন না, তাঁর দেখাতে তো সমস্যা নেই। এ মন্তব্য তিনি রাগ ও উপহাসের সুরেই করেন বলে বক্তব্যের ধরন থেকে বোঝা যায়। এটি তাঁর প্রকৃত কোনো ঘোষণা কি না, তা স্পষ্ট নয়।

 বক্তব্যের একটি পর্যায়ে পরীমনি নিজের দিকে দেখিয়ে বলেন আমাকে যেভাবে দেখা যাচ্ছে  এটা হচ্ছে ‘অথেন্টিক’ পেছনে দৃশ্যমান জিনিস, যেমন লাল ও কালো জুতা, দেখিয়ে বলেন, এগুলো হচ্ছে ‘অথেন্টিক’ ও ‘অরিজিনাল’। অর্থাৎ ছড়ানো ভিডিও ভুয়া হলেও তাঁর এই বার্তাটি নিজের এবং এটি হলো তার ‘অরিজিনাল’ ভিডিও।

অনেকে তাঁকে মামলা করার পরামর্শ দিচ্ছেন উল্লেখ করে পরীমনি জানান, আইনি পথে হাঁটতে তিনি আগ্রহী নন। তাঁর ভাষ্য, মামলা করলে উল্টো তাঁরা একাধিক মামলায় জড়িয়ে দিয়ে ক্ষতি করার সুযোগ পায়। তিনি বলেন, “যা হবে সরাসরি” হবে।

 তিনি বলেন, কেউ গালি দিলে তিনিও গালি দেবেন। একটি চড় খেলে তিনি চৌদ্দটি চড় ও একটি জুতা খেলে চৌদ্দটি জুতা মারবেন। তাঁর ভিডিও কেউ ছড়ালে তিনি ওই ব্যক্তির ‘চৌদ্দ গুষ্টির’ ভিডিও প্রকাশ করবেন, এমন মন্তব্যও করেন। কেউ ক্ষতি করে একবার ক্ষমা চাইলে তিনি পাল্টা জবাব দিয়ে হাজার বার ক্ষমা চাইতেও রাজি, এ কথাও ব্যঙ্গ করে বলেন। বক্তব্যে একপর্যায়ে তিনি এমনও বলেন, "মাছরাঙা টেলিভিশন যদি এমন একটি কাজ করে সেটা 'হ্যাক হয়েছে' বলে বলতে পারে, বা 'সামান্য সরি' বলে পার পেয়ে যেতে পারে, তাহলে তিনিও গালাগালি করে পরে অনুতপ্ত হয়ে, 'আউট অব মাইন্ড' ছিলেন বলে ক্ষমা চাওয়ার বিকল্পও তাঁর হাতে আছে।" এ মন্তব্যগুলোকে কেউ কেউ সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছেন।

আইনি দিক

বাংলাদেশের প্রচলিত সাইবার আইন অনুযায়ী, কারও অনুমতি ছাড়া তাঁর যৌনতাপূর্ণ বা মানহানিকর ছবি-ভিডিও প্রকাশ, শেয়ার বা প্রচার দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে। কারও অ্যাকাউন্টে অনধিকার প্রবেশ করে সেখানে কনটেন্ট প্রকাশ করাও অপরাধ। ভিডিও ভুয়া হোক বা আসল, কারও নাম ও মুখ ব্যবহার করে এমন কনটেন্ট ছড়ানো গুরুতর আইনি ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে যাঁরা ভিডিও ডাউনলোড করে ছড়াচ্ছেন, তাঁরাও আইনের আওতায় আসতে পারেন। আবার কারও ব্যক্তিগত ভিডিও প্রকাশের হুমকি দেওয়াও আইনত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভুক্তভোগীরা চাইলে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট বা সাইবার ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করতে পারেন।

‘ভাইরাল লিংক’ ও সাইবার ঝুঁকি

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, “ভাইরাল ভিডিওর লিংক” নামে ছড়ানো অনেক লিংকই আসলে প্রতারণা বা ম্যালওয়্যারের ফাঁদ। এসব লিংকে ক্লিক করলে ফোন বা অ্যাকাউন্টের তথ্য চুরি হতে পারে। তাই কৌতূহলবশত এসব লিংকে ক্লিক করা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

মূল ঘটনা এক নজরে

১. সোমবার রাতে মাছরাঙা টেলিভিশনের ভেরিফায়েড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়। 

২. অ্যাকাউন্টে দুই অভিনেত্রীর নাম জড়িয়ে বিকৃত ভিডিওসহ পাঁচটি পোস্ট প্রকাশ করা হয়। দুটি ভিডিও দেড় লাখের বেশি ভিউ পায়।

৩. কর্তৃপক্ষ হ্যাকের কথা নিশ্চিত করে, নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং ভিডিও মুছে ফেলে। তারা আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

৪. ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে ভিডিওগুলো এআই বা ফেস সোয়াপ প্রযুক্তিতে তৈরি ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।

৫. মুছে ফেলার আগে ডাউনলোড করা ভিডিও নতুন করে ছড়ানো হচ্ছে।

৬. ১৭ তারিখ রাত ২টায় পরীমনি ফেসবুক পেজে ভিডিও বার্তায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

নাগরিকদের প্রতি সতর্কবার্তা

১. যাচাই না করে কোনো ভিডিও বা লিংক বিশ্বাস কিংবা শেয়ার করবেন না।
২. “লিংক আছে” ধরনের মন্তব্য বা বার্তা থেকে সাবধান থাকুন, এগুলো প্রতারণার ফাঁদ হতে পারে।
৩. এ ধরনের কনটেন্ট দেখলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করুন এবং ছড়ানো থেকে বিরত থাকুন।
৪. সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখুন।
৫. কারও ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া অনলাইনে ছড়াবেন না, কারণ এগুলো ডিপফেকে অপব্যবহৃত হতে পারে।

বিজ্ঞাপন